কেন বাড়ছে কলড্রপ, অসন্তোষ

গ্রামীণফোনের কলড্রপ রেট ৩.৩৮%, রবির ১.৩৫%, বাংলালিংকের ০.৫৮% এবং টেলিটকের ১.৫৮%।

নিজস্ব প্রতিবেদক:

 একদিকে কলড্রপ, অন্যদিকে ইন্টারনেটের গতি—এই দুই নিয়ে ভোগান্তির শেষ নেই দেশের মোবাইল ব্যবহারকারীদের। বছর শেষে মোবাইল বা ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেলেও ভোগান্তি নিরসনে উদ্যোগ নেই অপারেটরদের।১৮ ফেব্রুয়ারি, সোমবার মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর সেবার মান অর্থাৎ কোয়ালিটি অব সার্ভিস নিয়ে প্রথমবার ড্রাইভ টেস্ট পরিচালনার ফল প্রকাশ করে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)।

বিটিআরসি জানিয়েছে, ঢাকা শহরে ২০১৮ সালের ৬ নভেম্বর থেকে ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, দেশের চার অপারেটরের মধ্যে গ্রামীণফোন কলড্রপে এক বছরের আগের অবস্থানেই রয়েছে। অপারেটরটির কলড্রপের হার (কলড্রপ রেট ৩.৩৮%) বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে অপারেটরটির কল কানেক্টিংয়ের সময়, কমেছে ফোরজি ইন্টারনেটের গতি।

শুধু গ্রামীণফোন নয়, ফোরজি ইন্টারনেটের গতি কমেছে রবি ও বাংলালিংকেরও। বিটিআরসির ফলাফল অনুযায়ী, বিটিআরসির দেওয়া মানদণ্ডে অন্যান্য অপারেটরের চেয়ে গ্রামীণফোন পিছিয়ে রয়েছে তিনটি ক্ষেত্রেই। এ ছাড়া রবি, বাংলালিংক এবং টেলিটক পিছিয়ে রয়েছে দুইটি ক্ষেত্রে।

এই প্রতিবেদনে খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয়েছে, ঠিক কী কারণে গ্রামীণফোনের কলড্রপ ও অসন্তোষ বাড়ছে।

কেস স্ট্যাডি: ১

সোমবার বিটিআরসি কর্তৃক কোয়ালিটি অব সার্ভিসের ফলাফল প্রকাশের আগে গত বছরের অক্টোবরে কলড্রপ সংক্রান্ত একটি পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছিল বিটিআরসি। এক বছরের (২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) ওই পরিসংখ্যানে কলড্রপে এগিয়ে ছিল গ্রামীণফোন।

বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, ওই এক বছরে গ্রামীণফোনের কলড্রপের সংখ্যা ছিল ১০৩ কোটি। দ্বিতীয় স্থানে ছিল রবি, অপারেটরটির কলড্রপ হয়েছে ৭৬ কোটি।

এ ছাড়া বাংলালিংকের কলড্রপের সংখ্যা ছিল ৩৬ কোটি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত অপারেটর টেলিটকের কলড্রপের সংখ্যা ছিল ৬ কোটি।

ওই সময়ে গ্রামীণফোনের কলড্রপ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, বর্তমান ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার।

কেস স্ট্যাডি: ২

কলড্রপ, নেটওয়ার্ক কাভারেজসহ অন্যান্য সমস্যায় জর্জরিত মোবাইল ব্যবহারকারীদের নম্বর একই রেখে অপারেটর বদলের সুযোগ করে দেয় বর্তমান সরকার। ভোগান্তি থেকে পরিত্রাণ পেতে গত বছরের ১ অক্টোবর থেকে চালু হয় নম্বর অপরিবর্তিত রেখে অপারেটর বদল বা এমএনপি সেবা।

এই সেবা গ্রহণের মধ্য দিয়ে নম্বর একই রেখে অপারেটর পরিবর্তনের সুযোগ পান ব্যবহারকারীরা।

সম্প্রতি প্রকাশিত বিটিআরসির পরিসংখ্যান বলছে, এমএনপি সেবা চালুর পর গত চার মাসে (২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত) সংখ্যার হিসাবে বেশি গ্রাহক হারিয়েছে গ্রামীণফোন।

অপারেটরটি হারিয়েছে ৬২ হাজার ৩১৭ জন ব্যবহারকারী। অপরদিকে সংখ্যার দিক থেকে বেশি গ্রাহক ৯৩ হাজার ৮২৮ জন যোগ হয়েছে রবিতে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এমএনপি সেবার মাধ্যমে চার মাসে মোট এক লাখ ৩৩ হাজার ৬২১ জন ব্যবহারকারী অপারেটর বদল করেছেন। এ ছাড়া গত চার মাসে রবি ২৩ হাজার ৯১১ জন, বাংলালিংক ৪৫ হাজার ৯২ জন এবং টেলিটক দুই হাজার ৩০১ জন গ্রাহক হারিয়েছে।

গ্রামীণফোন ভুগছে কেন?

উপরের দুই কেস স্ট্যাডি থেকে দুইটি বিষয় লক্ষণীয়। প্রথম কেস স্ট্যাডি অনুযায়ী, গ্রামীণফোনের কলড্রপের সংখ্যা বেশি। এর পরের অবস্থানে রয়েছে রবি।

দ্বিতীয় কেস স্ট্যাডি অনুযায়ী, এমএনপির সেবার মাধ্যমে গ্রামীণফোন গ্রাহক হারিয়েছে বেশি, বিপরীতে রবি গ্রাহক পেয়েছে বেশি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, গ্রাহক অনুপাতে তরঙ্গ না থাকায় ভুগতে হচ্ছে দেশের বড় অপারেটরটিকে। ফলে রবিসহ অন্যান্য অপারেটরের দিকে ঝুঁকছেন মোবাইল সিম ব্যবহারকারীরা।

খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতি ১০ লাখ মোবাইল ব্যবহারকারীদের জন্য বর্তমানে শূন্য দশমিক ৮২ মেগাহার্টজ তরঙ্গ বরাদ্দ রয়েছে, যা অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, শ্রীলংকায় ১০ লাখের জন্য ৬.২১ মেগাহার্টজ , মালয়েশিয়ায় ৫.১৯ মেগাহার্টজ ও আফগানিস্তানে ৬.৮৪ মেগাহার্টজ তরঙ্গ বরাদ্দ রয়েছে।

দেশের প্রায় প্রতিটি অপারেটরের তরঙ্গ ঘাটতি থাকলেও গ্রামীণফোনের ক্ষেত্রে এই ঘাটতির পরিমাণ বেশি।

বিটিআরসির দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দেশের মোট মোবাইল সিম ব্যবহারকারীর প্রায় ১৫ কোটি ৭০ লাখের মধ্যে ৭২৭ লাখ গ্রামীণফোনের গ্রাহক এবং ৪৬৯ লাখ রবির গ্রাহক।

এর মধ্যে গ্রামীণফোনের মোট তরঙ্গ রয়েছে ৩৭ মেগাহার্টজ এবং রবির রয়েছে ৩৬.৪ মেগাহার্টজ। এই দুই অপারেটরের তরঙ্গের তুলনায় রবির থেকে গ্রামীণফোনের ০.৬ মেগাহার্টজ বেশি রয়েছে।

খসড়া হিসাবে দেখা যায়, গ্রামীণফোনের প্রতি ১০ লাখ গ্রাহক পায় শূন্য দশমিক ৫১ মেগাহার্টজ তরঙ্গ। অপরদিকে রবি, বাংলালিংক ও টেলিটকের গ্রাহক পায় যথাক্রমে ০.৭৮ মেগাহার্টজ, ০.৯১ মেগাহার্টজ এবং ৬.৫৪ মেগাহার্টজ তরঙ্গ।

প্রায় সমসংখ্যক তরঙ্গের বিপরীতে রবির থেকে দেড়গুণের বেশি গ্রাহক রয়েছে গ্রামীণফোনের। খাত সংশ্লিষ্টদের দাবি, এত পরিমাণ গ্রাহকের বিপরীতে পর্যাপ্ত তরঙ্গ না থাকায় গ্রাহক সেবায় হিমশিম খেতে হচ্ছে গ্রামীণফোনকে। ফলে কলড্রপসহ অন্যান্য সমস্যায় ভুগছেন এই অপারেটরটির সিম ব্যবহারকারীরা।

এদিকে গ্রামীণফোনের এই দশার জন্য তরঙ্গ ঘাটতিকে দায়ী করেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। তার ভাষ্য, ‘সবচেয়ে খারাপ সার্ভিস গ্রামীণফোনের। এর প্রধান কারণ হচ্ছে তাদের তরঙ্গ নেই। তার যে পরিমাণ গ্রাহক আছে, সে পরিমাণ তরঙ্গ নেই।’

একই প্রসঙ্গে সম্প্রতি দেশের একটি দৈনিক পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মোস্তাফা জব্বার বলেছেন, ‘আমি তাদের (গ্রামীণফোনকে) বারবার বলেছি, তোমরা সেবার মান বাড়াও। এক বছর আগে ওয়ার্ল্ড মোবাইল কংগ্রেসে গ্রুপ সিইওকে আমি বলেছি, সেবার মান না বাড়ালে তোমরা বাংলাদেশে ব্যবসা করতে পারবা না। এবারও সেখানে যাচ্ছি, আবারও বলব। আসলে তারা স্পেকট্রাম কিনতে চায় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘গত নির্বাচনের আগে তারা আমাকে চিঠি দিয়ে স্পেকট্রাম কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। একটা মিটিংও হয়েছে। তারপর আর কোনো অগ্রগতি নেই। আমি তাদের বলেছি, এক বা দুই মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম কেনার প্রস্তাব নিয়ে আমার কাছে এসো না। বেশি করে কিনতে চাইলে আমি বিষয়টা দেখব। তারা বলে, স্পেকট্রামের দাম বেশি। তাই যদি হয় তাহলে তোমরা লাভ করছ কীভাবে? ব্যবসা করবা, কিন্তু কাঁচামাল কিনবা না তাহলে কীভাবে ব্যবসা চলবে।’

গ্রামীণফোনের ভাষ্য

গ্রামীণফোনের কলড্রপ সমস্যা, এমএনপিতে পিছিয়ে পড়া—এসব বিষয়ে জানতে অপারেটরটির জনসংযোগ বিভাগের সঙ্গে মেইলে যোগাযোগ করা হয়।

অপারেটরের কাছে প্রশ্ন ছিল, এমএনপির মাধ্যমে বেশি গ্রাহক হারাচ্ছে গ্রামীণফোন। কথিত রয়েছে, গ্রামীণফোনের যে পরিমাণ তরঙ্গ রয়েছে তা পর্যাপ্ত নয়। ফলে গ্রাহকরা গ্রামীণফোন ছেড়ে অন্য অপারেটরে বেশি যাচ্ছে। এ বিষয়ে গ্রামীণফোনের বক্তব্য কী? এ ছাড়াও তরঙ্গ কেনার বিষয়ে কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি না?

ফিরতি মেইলে তরঙ্গের বিষয়ে কোনো উত্তর দেয়নি মোবাইল অপারেটরটি।

তবে এমএনপির বিষয়ে গ্রামীণফোন জানিয়েছে, তারা গ্রাহকের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। এমএনপি সেবার মাধ্যমে তাদের কিছু গ্রাহক চলে গেলেও অন্য অপারেটরদের কিছু গ্রাহক তাদের নেটওয়ার্ককে বেছে নিয়েছে।

 

সংবাদটি সম্পর্কে মন্তব্য করুনঃ

Facebook comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>