৫২বিডি প্রতিবেদক, সিলেট : দশ বছর বয়সী মিছবাহ উদ্দীন। পরনে নীল রংয়ের ময়লা শার্ট আর ছেড়া প্যান্ট। বাঁশের খুঁটিতে বেঁধে ছোট ছোট বাহারি পণ্যসামগ্রী নিয়ে ঘোরাঘুরি করছে সিলেট নগরের চৌহাট্টা পয়েন্টে।

তার মুখের আওয়াজ ছিল খানিকটা এরকম; ‘এই ক্লিপ, চিরুণী, ফিতা, চুরি, টিপ, খেলনা’ লাগবে…।

ইশারায় ডাক দিতেই সে বলে ওঠে, কিচ্ছু লাগবো নি মামা? সাংবাদিক পরিচয় দিলে ভুল ভাঙে তার। এসময় এ প্রতিবেদকের সাথে কিছুক্ষণের জন্য গল্প জমে ওঠে এই মিছবাহ নামে অল্পবয়সী ফেরিওলার।

মিসবাহ জানায়, তার বাবার নাম শফিক মিয়া। পেশায় একজন রিক্সা চালক ছিলেন। বছর দু’এক আগে তিনি মারা গেছেন। আর রেজিয়া নামের তার মা বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ করেন। তাদের বাড়ি ছিলো হবিগঞ্জে। একভাই আর এক বোনকে নিয়ে অনেক আগে সিলেটে এসেছেন তার বাবা-মা। তিন ভাই-বোনের মধ্যে মিসবাহ দ্বিতীয়।

জাগো সিলেটকে মিছবাহ বলে- বেশ কিছুদিন আগে তার বড় ভাই মাদকদ্রব্যসহ পুলিশের হাতে আটকা পড়ে, আর মা অসুস্থ। তাইতো অনেকটা পরিবারের হাল ধরতেই এ পেশা বেছে নিয়েছে সে।

বিদ্যালয়ে যায় কি না জানতে চাইলে সে অনেকটা দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়েই বলে ওঠে, ‘আমরার ভাগ্যত ইতা নাই মামা।’ সে বলে তার যাই হোক সে চায় তার বোনটি যাতে বিদ্যালয়ে যায়। সে যেন লেখাপড়া করতে পারে।

সে বলে ওঠে, ‘আম্মায় স্কুলো ভর্তি করছিলা, কিন্তু আমি ইশকুলে যাইতাম না। আম্মায় স্কুলো যাইবার লাগি বকতা, আমি হুনতাম না। তখন আম্মায় কইতা, তোর বাফে কিতা জমিদারি রাকিয়া গেছইন নি। ঘরো বইয়্যা থাকলে তোরে খাওয়াইবো কে?।’

‘ভাইরে পুলিশ ধরিয়া নেওয়ার বাদে আমি ই ব্যবসাত নামছি। আম্মা অখন আর আমারে কিচ্ছু কয় না।’

শহরের দরগা এলাকার পাশেই একটি কলোনিতে পরিবারের সাথেই থাকে মিসবাহ। তার ওই ভাই রিক্সা চালাতো। প্রতিদিন নগরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে এসব পণ্যসামগ্রী ঝুলিয়ে বিক্রি করে সে। তার কাছে সর্বোচ্চ দামের জিনিস হচ্ছে ২০ টাকা মূল্যের চিরুনী, সর্বনিম্ন দামের জিনিস ১টাকা মূল্যের চকলেট। এছাড়াও তার এখানে ৫ থেকে ২০ টাকার মধ্যে তরুণীদের মাথার ক্লিপ, চুল বাধাঁর ফিতা, মাথার বেন, চিরুনী, বাচ্চাদের খেলনা সামগ্রীসহ হরেকপণ্য আছে। এছাড়াও সে পণ্যসামগ্রীর বিনিময়ে মহিলাদের ঝড়ে যাওয়া মাথার চুল সংগ্রহ করে বিক্রি করে।

সে জানায়, প্রতিদিন ২০০ টাকার মতো বিক্রি করলে অর্ধেক লাভ হয়। আর মাসে চুল বিক্রি করেও অনেক টাকা পায় সে।

তার সাথে কথা বলতে বলতেই সন্ধ্যা নেমে আসে। সড়কে জ্বলে ওঠে নগরবাতি।

এমন সময় একজন ক্রেতা এসে হাজির হন মিসবাহের কাছে। তিনি প্রয়োজনী কিছু কিনে টাকা দেয়ার সময় তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী রে পিচ্চি, তুই এই বয়সে লেখাপড়া না করে ব্যবসায় নেমেছিস কেন?’

মিসবাহের কণ্ঠে তখন শুনাগেল বিষাদের সুর। ‘লেখাপড়া করিয়া আমার বড় অওয়ার সুযোগ নাই, এরলাগি যাইনা স্কুলো। দোআ করবা টেকাটা জমাইয়্যা বইনটারে যাতে বড় করতাম পারি।’

সংবাদটি সম্পর্কে মন্তব্য করুনঃ

Facebook comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>