মা ও বোনের সঙ্গে বাড়িতে এহসান।

হয়রানিমূলক মামলা থেকে মুক্তি পেয়ে লেখাপড়ায় মনোযোগী হতে চান নড়াইলের সন্তান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী এহসান হাবিব সুমন। ঢাকায় ১৩দিন জেল খেটে জামিনে মুক্ত হয়ে বর্তমানে গ্রামের বাড়ি নড়াইলে অবস্থান করছেন তিনি।

সুমনের বাবা প্রায় চার বছর আগে হৃদরোগে মারা যান। এরপর ঢাকায় টিউশনি ও কোচিং করিয়ে লেখাপড়া এবং সংসারের খরচ চালান তিনি। এহসানের সংসারে মা ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী এক বোন রয়েছেন। তবে এখন ‘মরার ওপর খাড়ার ঘা’ হয়েছে হয়রানিমূলক মামলাটি। এহসানের বাড়ি নড়াইলের কালিয়া উপজেলার পুরুলিয়া ইউনিয়নের নওয়াগ্রামে।

এহসানের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তিনি। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুইপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় তার কোনো সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও এ মামলার আসামি হিসেবে পুলিশ তাকে ক্যাম্পাস থেকে গ্রেফতার করে ১৯ ফেব্রুয়ারি। যদিও সংঘর্ষের দিন সুমন নিজের মোটরসাইকেলের নিবন্ধন ও বিমা করতে সংশ্লিষ্ট অফিসে ছিলেন।

কোচিংয়ের টাকা জমিয়ে যাতায়াতের সুবিধার্থে সম্প্রতি একটি মোটরসাইকেল কিনেছেন তিনি। ওইদিন বিআরটিএ অফিসে থাকলেও তাকে আসামি করে গ্রেফতার করা হয়। সংঘর্ষের ঘটনায় তার (এহসান) সংশ্লিষ্টতা না থাকার বিষয়টি পুলিশকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন তিনি। অবশেষে তার ঠিকানা হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে।

বিনা অপরাধে আটকের ঘটনায় কারাগারে থেকে আবেগঘন একটি চিঠি লেখেন সুমন। সেই চিঠি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়া একজনের মাধ্যমে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ প্রশাসনসহ জনপ্রতিনিধিদের মাঝে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ১৩দিন জেল খেটে গত ৩ মার্চ জামিনে মুক্তি পান তিনি। এরপর গত বুধবার (৬ মার্চ) গ্রামের বাড়ি নড়াইলের নওয়াগ্রামে আসেন তিনি।

এহসান আরো বলেন, ‘আমার জামিনের ব্যাপারে নড়াইল-১ আসনের সংসদ সদস্য কবিরুল হক মুক্তি, নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য মাশরাফি বিন মর্তুজা ও ডিএমপির যুগ্মকমিশনার শেখ নাজমুল আলমসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।’

এহসানের বন্ধু নওয়াগ্রামের মিরাজুল ইসলাম ও শাহীন মোল্যা বলেন, ‘আমাদের একটাই দাবি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের ওই মারামারি ঘটনায় আসামির তালিকা থেকে এহসানকে বাদ দেওয়া হোক।’

প্রতিবেশি হালিমা বেগম ও হিরু মোল্যা বলেন, ‘সুমনের বাবার মৃত্যুর পর অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া করছে সে। তাছাড়া সংসারের খরচও তার চালাতে হয়। সে খুবই ভালো ছেলে। তার ওপর যদি মিথ্যা মামলা চেপে বসে, তাহলে সে কোথায় যাবে! তাকে যেন রেহাই দেওয়া হয়।’

সুমনের মা রাবেয়া রাবেয়া বেগম বলেন, ‘আমার ছেলের আর যেন কোনো হয়রানি না হয়, স্বাভাবিক ভাবে যেন লেখাপড়া করতে পারে সরকারের প্রতি সেই আবেদন করছি। এছাড়া মা হিসেবে দাবি করছি, এ মামলা থেকে যেন আমার ছেলে দ্রুত রেহাই পায়।’

নড়াইলের নওয়াগ্রাম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জিয়াউল আলম বলেন, ‘এহসান আমাদের বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেছে। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা নেই। এখন আমাদের একটাই দাবি, এ মামলা থেকে সুমনকে মুক্তি দেওয়া হোক।’

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালের ১৭ আগস্ট সুমনের ১৮তম জন্মদিনে তার বাবা আজিজুর রহমান হৃদরোগে মারা যান। তখন উচ্চ মাধ্যমিক লেখাপড়ার পাশাপাশি পরিবারের দায়িত্বও তার কাঁধে এসে পড়ে। তাদের ২০ শতাংশ ফসলি জমি এবং পাঁচ শতকের ওপর বসতভিটা ছাড়া তেমন কিছু নেই।’

সংবাদটি সম্পর্কে মন্তব্য করুনঃ

Facebook comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>