ফেনী প্রতিনিধি:
ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যা মামলার অন্যতম আসামি কামরুন নাহার মনি কন্যা সন্তানের মা হয়েছেন। শুক্রবার ১২ টা ১০ মিনিটে ফেনীর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে স্বাভাবিক ডেলিভারির মাধ্যমে কন্যা সন্তান প্রসব করেন তিনি।

হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) মো. আবু তাহের পাটোয়ারী জানান, শুক্রবার রাতে প্রসব ব্যাথা নিয়ে আসামি কামরুন নাহার মনি ফেনী জেলা কারাগার থেকে জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়। রাত ১২ টা ১০ মিনিটে স্বাভাবিক ডেলিভারির মাধ্যমে কন্যা সন্তান জন্ম দেন তিনি।

স্বাভাবিক ডেলিভারি হওয়ায় মা ও শিশু উভয়ে সুস্থ্য রয়েছেন। শনিবার বিকাল বা রোববার সকালে আসামিকে হাসপাতাল থেকে অব্যাহতিপত্র (রিলিজ) দেয়া হবে।

ফেনী জেলা কারাগারের জেলার দিদারুল আলম জানান, শুক্রবার রাত ৮টার দিকে আসামি কামরুন নাহার মনির শারীরিক অবস্থায় খারাপ হলে কারাগার হাসপাতালের চিকিৎসকদের পরামর্শে মনিকে ফেনী জেনারলে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ফেনী মডেল থানা পুলিশ ও কারাগারের একাধিক কারারক্ষীদের (পুরুষ ও মহিলা) তত্ত্ব¡াবধানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে আসামি কামরুন নাহার মনি। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেলে কঠোর নিরাপত্তায় পুনরায় তাকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হবে।

বাদি পক্ষের আইনজীবী এম শাহজানান সাজু জানান, নুসরাত হত্যা (কিলিং মিশনে ৫ জনের একজন) মামলার অন্যতম আসামি কামরুন নাহার মনিকে গত ১৬ই এপ্রিল বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। গ্রেপ্তারের সময় মনি তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। গ্রেপ্তারের পরদিন ১৭ই এপ্রিল মনিকে আদালতে তুলে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে আদালত ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার সময় ব্যবহৃত বোরকাগুলো যে দোকান থেকে কেনা হয়েছিলো আসামি মনিকে নিয়ে গত ১৯শে এপ্রিল সে দোকানে অভিযান চালায় পিবিআই।

নুসরাত হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে গত ২০শে এপ্রিল মনি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। ঘটনার সময় বোরকা পরিহিত ৫ জনের মধ্যে একজন ছিলেন মনি। নুসরাতকে হাত-পা বাঁধার পর তিনি সহপাঠী নুসরাতকে ছাদে শুইয়ে দিয়ে গলা চেপে ধরে। আসামি জাবেদ হোসেন ঘটনার সময় নুসরাতের গায়ে এক লিটার কেরোসিন তেল ঢেলে দেয় এবং ম্যাচের কাঠি জ্বালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।

ফেনী জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) হাফেজ আহমেদ জানান, নুসরাত হত্যা মামলার বিচারকাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। স্বাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক চলছে। রোববার মামলার পরবর্তী শুনানি রয়েছে। চলতি সপ্তাহে মামলার বিচারকাজ শেষ হবে। চলতি মাসেই মামলার রায় প্রদানের সম্ভবনা রয়েছে বলে পিপি আসা করছেন।

প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ২৭শে মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন নিপীড়নের দায়ে মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এর জের ধরে গত ৬ই এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রী) মাদ্রাসায় আলিম পরীক্ষা কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে গেলে নুসরাতকে ছাদে ডেকে নিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে করা শ্লীলতহানির মামলা তুলে না নেয়ায় তাকে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে, যা মৃত্যুশয্যায় নুসরাত বলে গেছেন। এরপর টানা পাঁচদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ১০ই এপ্রিল মারা যান নুসরাত জাহান রাফি।

এ ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদি হয়ে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলাসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। পরে মামলাটি হত্যা মামলায় রুপান্তর হয়। গত ১০ই এপ্রিল মামলাটি পিবিআইতে হস্তান্তর করা হয়। এ মামলায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ২১ জনকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। এদের মধ্যে মাদ্রাসার বরখাস্তকৃত অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা, কামরুন নাহার মনিসহ ১২ জন আসামি হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি দিয়েছিল। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআইয়ের পরিদর্শক মোহাম্মদ শাহ আলম তদন্ত শেষে গত ২৯ মে নুসরাত হত্যায় ১৬ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। চার্জশিটে ৯২ জনকে সাক্ষী করা হয়।

সংবাদটি সম্পর্কে মন্তব্য করুনঃ

Facebook comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>