নিজস্ব প্রতিবেদক::না ফেরার দেশে চলে গেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সিলেটের বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, জেলা পরিষদ সিলেটের চেয়ারম্যান, সাবেক গণপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট লুৎফুর রহমান।

বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে লুৎফুর রহমান ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় এক ব্যক্তিত্ব। দলের জন্য ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ এক নেতা। ৮১ বছরের জীবনে তিনি মানুষের জন্য করেছেন অনেককিছু। তার কীর্তিগুলো কখনো ম্লান হবে না।

মো. লুৎফুর রহমান সিলেট জেলার সাবেক বালাগঞ্জ থানা- বর্তমানে ওসমানীগর উপজেলাধীন ৩নং পশ্চিম পৈলনপুর ইউনিয়নের বড়হাজীপুর গ্রামে ১৯৪০ ইংরেজির ৮ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন।

নিজ গ্রামের সরকারি প্রাথমিক স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করে মৌলভীবাজার জেলার সরকারি হাইস্কুলে ভর্তি হন। ১৯৫৯ ইংরেজি সালে অংকে লেটার মার্কসহ কৃতিত্বের সাথে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা পাশ করেন তিনি।

১৯৫৯ ইংরেজিতে সিলেট এম.সি কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন এবং একই কলেজ থেকে আই.এস.সি এবং বিএসসি পরীক্ষা পাশ করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন এবং এল.এল.বি পাশ করে সিলেট জেলা কোর্টে আইন পেশায় যোগদান করেন।

১৯৬২ সালে লুৎফুর রহমান এবং তাঁর আরও কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে সিলেট জেলা ছাত্রলীগ পুন:গঠন করেন। ১৯৬২ সালে লুৎফুর রহমানের নেতৃত্বে আইয়ূব খান বিরোধী আন্দোলন আরম্ভ করে ছাত্রলীগ। একই সালে হামিদুর রহমানের শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন তিনি।

১৯৬৩ সালের সেপ্টেম্বরে পূর্ব পাকিস্থান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে সিলেট থেকে লুৎফুর রহমানের নেতৃত্বে ১০ জন কাউন্সিলার যোগদান করেন। পুরান ঢাকার পাকিস্থান মাঠে ছাত্রলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তখন পূর্ব পাকিস্থান ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন শাহ মোজ্জেম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি। ওই সম্মেলনে প্রখ্যাত আইনজ্ঞ বিচারপতি ইব্রাহিম সাহেব প্রধান অতিথি হিসাবে যোগদান করেন। এই সম্মেলনে কে.এম উবায়দুর রহমান সভাপতি সিরাজুল আলম খান সাধারণ সম্পাদক এবং আব্দুর রাজ্জাক সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা আন্দোলনে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেন লুৎফুর রহমান। সামরিক সরকারের দশটি বেত্রাঘাতের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে ছয় দফার পুস্তিকা বিতরণ করেন তিনি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করেন এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যান লুৎফুর রহমান।

১৯৭০ ইংরেজিতে বঙ্গবন্ধু তাঁকে প্রাদেশিক পরিষদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেন এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে তিনি বালাগঞ্জ থানা এবং ফেঞ্চুগঞ্জ থানা নিয়ে গঠিত নির্বাচনী এলাকা থেকে বিপুল ভোটে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

পরবর্তী সময়ে আন্দোলনে যোগদান করে মুক্তিযোদ্ধে অংশগ্রহণ করেন লুৎফুর রহমান। তিনিসহ সিলেটের আরও কয়েকজন এমপিএ এসময় আসামের করিমগঞ্জ শহরে অবস্থান করে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেন। করিমগঞ্জে টাউন হলে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানকারী যুবকরা জমায়েত হয়। লুৎফুর রহমান ও আব্দুল লাতিফ এম.পি.এ সাহেব টাউন হলের দায়িত্বে ছিলেন এবং যুবকদের খাওয়া-দাওয়া এবং কাপড়ের ব্যবস্থা করে দিতেন।

করিমগঞ্জে স্থানীয় নেতৃবৃন্দ অনেক সাহায্য করেন তাদের। এই ক্যাম্প থেকে প্রতি সপ্তাহে গেরিলা ট্রেনিং নেওয়ার জন্য যুবকদেরকে ট্রেনিং কেন্দ্রে পাঠাতেন লুৎফুর রহমান। দেওয়ান ফরিদ গাজী এম.এন.এ সাহেবের সাথে ৩ নং এবং ৪ নং সেক্টরে সিভিল এফ্যায়ার্স সাহায্যকারী হিসাবে কাজ করেন তিনি।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে পুনর্বাসন কাজে আমি দিন-রাত পরিশ্রম করেন লুৎফুর রহমান। ১৯৭২ সালে তিনি গণপরিষদের সদস্য হন এবং হাতে লেখা সংবিধানে স্বাক্ষর করে সংবিধান পাশ করায় অংশগ্রহণ করে।

বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পরে লুৎফুর রহমানকে আটক করে অনেক নির্যাতন করা হয়। পরবর্তীতে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করতে কার্যক্রম চালিয়ে যান তিনি। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মনোনীত হন। পরবর্তী সময়ে লুৎফুর রহমান জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি, এরপরে সিনিয়র সহ-সভাপতি এবং সর্বশেষ ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মনোনীত হন।

২০১৬ সালের ২১ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অ্যাডভোকেট লুৎফুর রহমানকে সিলেট জেলা পরিষদের প্রশাসকের দায়িত্বে নিয়োগ দেন এবং মৃত্যু পর্যন্ত তিনি সে দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে গেছেন।

সংবাদটি সম্পর্কে মন্তব্য করুনঃ

Facebook comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>