মো.আব্দুর রব খিজির ::বাংলা চলচ্চিত্র জগতের ‘রাজপুত্র’ বলা হয় শালমান শাহকে। মৃত্যুর দুই যুগ পর এখনও তার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ও আবেদন। বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে আরও অনেক বেশি রঙিন হয়েছে তাকে নিয়ে ভালোবাসার রঙ। এখনও টিভি পর্দায় তার অভিনীত ছবি প্রচার হলে দর্শক আগ্রহ নিয়ে দেখেন। ক্ষণজন্মা এই নায়ক রেখে গেছেন ২৭টি চলচ্চিত্র এবং অগণিত ভক্ত।

নব্বইয়ের দশকে রুপালি পর্দায় অভিষেক ঘটা সালমান শাহ পর্দা থেকে বেরিয়ে হয়ে উঠেছিলেন কোটি তরুণ-তরুণীর স্বপ্নের নায়ক। শুরুতেই বিশাল সাফল্য দিয়ে সালমান প্রাণসঞ্চার করে দিলেন মৃতপ্রায় চলচ্চিত্রে। তারপর শুধুই ইতিহাস। কেউ কেউ বলে থাকেন, সালমানের মতো জনপ্রিয় নায়ক হয়তো আর কখনোই কোনো দিন জন্মাবে না এই ইন্ডাস্ট্রিতে।

আজ সেই অমর নায়কের জন্মদিন। ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন সালমান শাহ। তার বাবার নাম কমর উদ্দিন চৌধুরী এবং মায়ের নাম নীলা চৌধুরী। তিনি ছিলেন পরিবারের বড় ছেলে। সালমানের জন্মনাম শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন। তবে চলচ্চিত্রে তিনি সবার কাছে সালমান শাহ নামেই পরিচিত ছিলেন।

বেঁচে থাকলে আজ ৫০ পেরিয়ে ৫১ বছরে পা দিতেন অসংখ্য ভক্তের এই স্বপ্নের নায়ক। সালমানবিহীন এদেশে দীর্ঘ দিন ধরেই তার জন্মদিন উদযাপন হয়ে আসছে। যা অন্য কোনো প্রয়াত নায়কের বেলায় চোখে পড়ে না কখনো। এদিক বিবেচনায় এটা বড় একটি রেকর্ড। ১৯ সেপ্টেম্বর দিনটি এলে সালমান-ভক্তরা তার জন্মদিনের কেক কাটেন এখনো।

সালমান শাহ পড়াশুনা করেন খুলনার বয়রা মডেল হাইস্কুলে। ওই স্কুলে চিত্রনায়িকা মৌসুমী তার সহপাঠী ছিলেন। পরে ১৯৯৩ সালে একই সঙ্গে দুজনের চলচ্চিত্রে অভিষেক হয়। সালমান-মৌসুমী জুটি বেঁধে অভিনয় করেন সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবিতে। সেই থেকে একবারের জন্যও পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।

মাত্র চার বছরের ক্যারিয়ারে ২৭টি ছবিতে অভিনয় করেন সালমান শাহ। সেগুলোর প্রায় সবগুলোই সুপারহিট। তার অভিনীত ছবিগুলোর মধ্যে অন্যতম অন্তরে অন্তরে, সুজন সখী, স্বপ্নের নায়ক, স্বপ্নের ঠিকানা, চাওয়া থেকে পাওয়া পাওয়া, জীবন সংসার, প্রেম প্রিয়াসী, সত্যের মৃত্যু নেই, মায়ের অধিকার, এই ঘর এই সংসার, তোমাকে চাই, আনন্দ অশ্রু, বুকের ভেতর আগুন ইত্যাদি।

সালমান শাহর সঙ্গে চিত্রনায়িকা শাবনূরের জুটি ছিল সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে সেরা জুটিও বলেন অনেকে। এই জুটির প্রতিটি ছবিই সুপারহিট। তাদের পর্দার রসায়ন ছিল নজরকাড়া। তাদের বাস্তব জীবনের রসায়ন নিয়েও তুমুল আলোচনা হতো। সালমান শাহর সঙ্গে শাবনূরের সে সময়কার সম্পর্ক নিয়ে এখনো কম-বেশি চর্চা হয়।

চলচ্চিত্রে অভিষেকের আগের বছর অর্থাৎ ১৯৯২ সালের ১২ আগস্ট খালার বান্ধবীর মেয়ে সামিরা হককে বিয়ে করেন সালমান শাহ। সামিরা ছিলেন বিউটি পার্লার ব্যবসায়ী। তিনি সালমানের দুটি চলচ্চিত্রে তার পোশাক পরিকল্পনাকারী হিসেবেও কাজ করেন।

দাম্পত্য জীবনের পাঁচ বছরের মাথায় ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর হঠাৎই সালমানের মৃত্যু খবর ছড়িয়ে পড়ে। এদিন ঢাকার ইস্কাটনে নিজ বাসার সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় তার দেহ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করা হলেও তার মৃত্যু নিয়ে রহস্য থেকে যায়।

অনেকেই সালমান শাহর মৃত্যুর জন্য তার স্ত্রী সামিরার দিকে অভিযোগের আঙুল তোলেন। পরবর্তীকালে সালমানের পরিবারের পক্ষ থেকে স্ত্রী সামিরা ও আরো কয়েকজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়। কিন্তু পরে এই মামলার আর কোন অগ্রগতি হয়নি। ফলে সালমানের মৃত্যু নিয়ে রহস্য আজও উদঘাটিত হয়নি। ২০২০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি পুলিশের তদন্ত বিভাগ জানায় যে সালমান শাহ আত্মহত্যাই করেছিলেন।

১৯৯৬ সালে সালমান শাহর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে সেই শোক সইতে না পেরে আত্মঘাতি হন বেশ কয়েকজন তরুণ-তরুণী। তারা সকলেই সালমানের অন্ধ ভক্ত ছিলেন। প্রিয় তারকার মৃত্যুর খবরে এভাবে তরুণ-তরুণীদের আত্মাহুতি দেওয়া পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। সেই সালমান শাহ মরেও অমর হয়ে আছেন এ দেশের লাখো ভক্তের হৃদয়ে।

সংবাদটি সম্পর্কে মন্তব্য করুনঃ

Facebook comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>