বায়ান্ন ডেস্ক :: প্রায় দুই বছর ধরে বিআরটিএ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স সরবরাহ করতে পারছে না। লিখিত, মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও ড্রাইভিং লাইসেন্স পাচ্ছেন না ১২ লাখ ৪৫ হাজার গাড়িচালক।

নানা অজুহাতে স্মার্টকার্ড ছাপা না হওয়ায় প্রায় দুই বছর থেকে ১২ লাখ ৪৫ হাজার মানুষ স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স এর অপেক্ষায়। তবে এবার সেই অপেক্ষার অবসান হচ্ছে। কারণ, অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে শুরু হচ্ছে স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স বিতরণের কাজ। এ জন্য সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও সেনাবাহিনীর অধীন মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি (বিএমটিএফ) প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এদিকে আটকে পড়া লাইসেন্সের মধ্যে কমপক্ষে দেড় লাখ বিদেশযাত্রী রয়েছেন। লাইসেন্স না পাওয়ায় দক্ষতার অভাবে তারা বিদেশে যেতে পারছেন না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, করোনার মধ্যে শুধু আঙ্গুলের ছাপ না নেওয়ায় কমপক্ষে ছয় লাখ আবেদনকারী বিপাকে পড়েছেন। এ সমস্যার সুরাহা করতে উদ্যোগ নিয়েছে বিআরটিএ। সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে স্থাপিত এনরোলমেন্ট স্টেশনে আবেদনকারীদের আঙ্গুলের ছাপ নেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

বিআরটিএর পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) শীতাংশু শেখর বিশ্বাস বলেন, আটকে থাকা সব ড্রাইভিং লাইসেন্স অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ধাপে ধাপে সরবরাহ করতে পারব। সব ধরনের প্রস্ততি নেওয়া হয়েছে।

বিআরটিএর এই কর্মকর্তা আরও বলেন, গত ২৯ আগস্ট বিএমটিএফের সঙ্গে বিআরটিএর এ সংক্রান্ত চুক্তি সই হয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি হচ্ছে।

জানা গেছে, এ মাস থেকে শুরু করে ছয় মাসের মধ্যে আটকে থাকা সব ড্রাইভিং লাইসেন্স সরবরাহ শেষ করা হবে। তাতে দীর্ঘ দিন ধরে চলমান সংকট কেটে যাবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় দুই বছর ধরে বিআরটিএ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স সরবরাহ করতে পারছে না। অন্তর্বর্তীকালীন প্রাপ্তি স্বীকার রশিদ মোটরযান চালানোর অস্থায়ী অনুমতিপত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন চালকরা। লিখিত, মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও ড্রাইভিং লাইসেন্স পাচ্ছেন না ১২ লাখ ৪৫ হাজার গাড়িচালক।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও ড্রাইভার্স ট্রেনিং সেন্টারের চেয়ারম্যান মো. নুর নবী শিমু বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও চালকরা লাইসেন্স পাচ্ছেন না। তারা রাস্তায় স্লিপ নিয়ে চলছেন। পুলিশ তাদের হয়রানি করছে। এছাড়া কমপক্ষে দেড় লাখ চালক লাইসেন্স না পাওয়ায় বিদেশে চাকরিতে যোগ দিতে পারেননি। এ সমস্যার দ্রুত সমাধান দরকার।

এ অবস্থায় সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গত ৮ সেপ্টেম্বর বিআরটিএ প্রধান কার্যালয়ে মতবিনিময় সভায় বলেছেন, ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানে বিলম্ব তথা ধীরগতি আমাদের সব অর্জনকে ম্লান করে দিয়েছে। তাই কোনোভাবেই আর বিলম্ব করা যাবে না। সড়কমন্ত্রীর তাগাদার পর ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়ায় গতি বাড়ানো হয়েছে।

বিআরটিএর সড়ক নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক মাহবুব-ই-রব্বানী বলেছেন, দ্রুত স্মার্ট কার্ড ছাপার কাজ শুরু হচ্ছে। বিএমটিএফ এই উদ্যোগ নিয়েছে। স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাপার কাজ শুরুর ছয় মাসের মধ্যে আটকে থাকা ১২ লাখ ৪৫ হাজার ড্রাইভিং লাইসেন্স সরবরাহের কাজ শেষ করবে প্রতিষ্ঠানটি।

বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, নতুন আবেদনের প্রেক্ষিতে লাইসেন্স দেবে মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্স। ড্রাইভিং লাইসেন্স সরবরাহের জন্য বিআরটিএর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান হচ্ছে মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্স। গত ৩১ ডিসেম্বর থেকে স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স সরবরাহ করার কথা ছিল প্রতিষ্ঠানটির। করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানটি দুই দফায় সময় বাড়িয়ে নেয়। এখন অবশ্য প্রতিদিন পল্লবীতে প্রতিষ্ঠানটির স্থাপন করা এনরোলমেন্ট স্টেশনে প্রতি কার্য দিবসে গড়ে প্রায় এক হাজার আবেদনকারীর আঙ্গুলের ছাপ সংগ্রহ করে লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে। চুক্তি অনুসারে, মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্স পাঁচ বছরে ৪০ লাখ স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স সরবরাহ করবে।

বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালের নভেম্বর থেকে স্মার্ট লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে। প্রথম পাঁচ বছর সরবরাহে সমস্যা হয়নি। এরপর থেকেই সংকট শুরু হয়। ধীরে ধীরে তা প্রকট রূপ নেয়। শুরু থেকে স্মার্ট কার্ড সরবরাহ করে আসছিল বিআরটিএর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান টাইগার আইটি বাংলাদেশ লিমিটেড। বিআরটিএর সঙ্গে কয়েক দফা চুক্তি হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটির।

দেশে গাড়ি চালানোর ড্রাইভিং লাইসেন্সের স্বাভাবিক সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় ২০১৯ সালের আগস্ট মাস থেকে। টাইগার আইটি বাংলাদেশ লিমিটেডের সঙ্গে বিআরটিএ এর চুক্তি শেষ হয় গত ২২ জুন। চুক্তির মেয়াদ ২০২১ সালের ২২ জুন পর্যন্ত থাকলেও বিপুল চাহিদার ফলে চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স সরবরাহ শেষ হয় ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে। টাইগার আইটির ১৫ লাখ স্মার্ট কার্ড গত ২২ জুনের মধ্যে দেওয়ার সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। অতিরিক্ত চাহিদার কারণে ২০১৯ সালের মার্চের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১২ লাখ কার্ড বিতরণ শেষ করে।

ড্রাইভিং লাইসেন্সের মধ্যবর্তী সংকট মোকাবিলার জন্য সতর্ক করে টাইগার আইটি এক বছর আগে থেকেই দফায় দফায় বিআরটিএ-কে চিঠি দিয়েছিল। কিন্তু বিআরটিএ যথাসময়ে উদ্যোগ নেয়নি বলে জানা গেছে। এক পর্যায়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে গভীর সংকট তৈরি হলে বিআরটিএর চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমানকে পদ থেকে সরিয়ে দেয় সরকার। উন্মুক্ত (আন্তর্জাতিক) দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ড্রাইভিং লাইসেন্স নেওয়ার লক্ষ্যে ২০২০ সালের ২৯ জুলাই মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্স প্রাইভেট লিমিটেডের সঙ্গে বিআরটিএ চুক্তি করে। সংকট সমাধানের জন্য দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু করা হলেও অতিরিক্ত ক্রয়াদেশ, দরপত্র/পুনঃদরপত্রের মাধ্যমে এ পণ্য ক্রয়ে আইনগত ও প্রক্রিয়াগত জটিলতা দেখা দেয়। ফলে লাইসেন্স সরবরাহের অতিরিক্ত চাহিদা মেটাতে পারেনি বিআরটিএ।

ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার জন্য আবেদন করে সব ধরনের পরীক্ষায় পাস করেও অধিকাংশ লাইসেন্স প্রত্যাশীরা দুই বছর ধরে অপেক্ষা করছেন। প্রয়োজনীয় ফি, ছবি ও আঙ্গুলের ছাপ দেওয়ার পরও স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স তারা পাচ্ছেন না। অবস্থা বেগতিক দেখে স্মার্ট কার্ড আকারে ড্রাইভিং লাইসেন্স না দিয়ে সাময়িক অনুমতিপত্র দেওয়া হচ্ছে।

বিআরটিএ থেকে বলা হয়েছিল, পুরনো প্রতিষ্ঠান টাইগার আইটি নতুন প্রতিষ্ঠান মাদ্রাজ সিকিউরিটিজ প্রিন্টার্সের কাছে গ্রাহকদের তথ্য হস্তান্তর করেনি। ফলে আগে থেকে আটকে পড়া লাইসেন্স সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে।

সূত্র : ঢাকা পোস্ট

সংবাদটি সম্পর্কে মন্তব্য করুনঃ

Facebook comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>