বায়ান্ন ডেস্ক :: ‘যেদিন নোমানের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করা হয় ওইদিন গণমাধ্যমের খবরে জানতে পারলাম নোমান বিদেশে অবস্থান করছে। সে নিজেই ওয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছে। সে ক্ষেত্রে আমাদের দাবি থাকবে প্রশাসন ইন্টারপোলের মাধ্যমে তাকে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করবে।’

শিশু আলফার বয়স তখন ছিল ২ মাস। মেয়েকে কোলে নিয়ে শেষবারের মতো আদর করে বেরিয়েছিলেন যুবক রায়হান আহমদ। এরপর লাশ হয়ে ফিরলেন ঘরে। গত বছরের ১০ অক্টোবর গভীর রাতে ‘চুরির অভিযোগে’ ধরে নিয়ে সিলেটের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে টানা ৩ ঘণ্টা নির্যাতন চালানো হয়। পরে অসুস্থ হয়ে পড়লে ১১ অক্টোবর ভোরে নেয়া হয় সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানেই চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। দিন পার হয়ে এ ঘটনার এখন এক বছর। শিশু আলফার বয়স চলছে ১৫ মাস। মায়ের সঙ্গে বাবা হত্যার বিচার দাবিতে গতকাল রোববার সে হাজির হয়েছিল সিলেটের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে।

নিহত রায়হানের পরিবারের পক্ষ থেকে মানববন্ধন করে হত্যাকারীদের ফাঁসি দাবি করা হয়। সে সঙ্গে এ মামলায় একমাত্র পলাতক আসামি কথিত সাংবাদিক আব্দুল্লাহ আল নোমানকে গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি রায়হানের মা সালমা বেগমের। আর সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার নিশারুল আরিফ বলেন, ‘নোমানকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা হবে।’

এদিকে চলতি বছরের ৫ মে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) আলোচিত এ মামলার চার্জশিট আদালতে জমা দেয়। ৩০ সেপ্টেম্বর আদালত অভিযোগপত্রটি গ্রহণ করেন। তবে এ মামলায় প্রধান আসামি বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির এসআই (বরখাস্তকৃত) আকবর হোসেন ভুঁইয়াসহ সকল আসামি বর্তমানে জেলে থাকলেও নোমান পলাতক থাকায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। পিবিআইর দেয়া প্রতিবেদনে নোমানকে নির্যাতনের প্রমাণ লোপাটের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। নোমান সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা ও স্থানীয় কয়েকটি পত্রিকার উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন। অপরদিকে রায়হানের ওপর নির্যাতনের ঘটনায় জেলহাজতে থাকা আকবরসহ পাঁচ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা তদন্তাধীন রয়েছে বলে জানিয়েছেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (গণমাধ্যম) বিএম আশরাফ উল্লাহ তাহের।

তবে রায়হান হত্যার এক বছরে এখনো কেবল চার্জশিট গ্রহণ হওয়ায় মামলার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে রায়হানের মা সালমা বেগম বলেন, ‘এক বছরে এখনো চার্জশিট গ্রহণ হলো। তাহলে বিচার শেষ হবে কত বছরে এটা নিয়ে আমি সন্দিহান। আমি চাই দ্রুত বিচার কার্যকর হোক। আমি সকল আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি চাই।’ এমনকি আকবরের পরিবারের পক্ষ থেকে বারবার সমঝোতার প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন রায়হানের মা সালমা বেগম।

অপরদিকে রায়হান হত্যা মামলার আইনজীবী ব্যারিস্টার এম এ ফজল চৌধুরী বলেন, যেদিন নোমানের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করা হয় ওইদিন গণমাধ্যমের খবরে জানতে পারলাম নোমান বিদেশে অবস্থান করছে। সে নিজেই ওয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছে। সে ক্ষেত্রে আমাদের দাবি থাকবে প্রশাসন ইন্টারপোলের মাধ্যমে তাকে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিলে তাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে জানান তিনি।

এদিকে একটি সূত্র জানিয়েছে, নোমান বর্তমানে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে অবস্থান করছে। সে ভারত হয়ে প্রথমে দুবাই যায়। কয়েক মাস সেখানে অবস্থানের পর প্যারিসে চলে যায়।

নোমানের গ্রেফতারের ব্যাপারে জানতে চাইলে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. নিশারুল আরিফ বলেন, নোমান কোথায় আছে সেটা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তার অবস্থান শনাক্তে ইতোমধ্যে কাজ চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, সে যেখানেই থাকুক তাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে আদালতের কিছু প্রক্রিয়া আছে। পলাতক আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। আসামিকে গ্রেফতার করা সম্ভব না হলে পুলিশ আদালতে প্রতিবেদন জমা দেবে। এর ভিত্তিতে আদালত তার সমস্ত সম্পত্তি জব্দ করার নির্দেশ প্রদান করবেন। পাশাপাশি আসামির বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করা হবে। তখন পুলিশ হেডকোয়ার্টারের এনসিবি ডিপার্টমেন্ট আন্তর্জাতিকভাবে নোমানকে গ্রেফতারে কাজ শুরু করতে পারবে। নোমানের অবস্থান শনাক্তের পর সে যে দেশে অবস্থান করছে সেখানে নোটিশ করা হবে। তখন ওই দেশের পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করবে।

সংবাদটি সম্পর্কে মন্তব্য করুনঃ

Facebook comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>